মেহেদী হাসান, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩, ঢাকা, বাংলাদেশ :
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মোফাসসিরে কোরআন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলমীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মুত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে জনাকীর্ণ বিচার কক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আজ এ ফাঁসির রায় ঘোষনা করেন।
মাওলানা সাঈদীকে দুটি হত্যার অভিযোগে মুত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ দুটি হল ইব্রাহীম কুট্টি এবং বিশাবালী হত্যার ঘটনা। মাওলানা সাঈদীর উপস্থিতিতে, নির্দেশে এবং সহযোগিতায় তাদের হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। এ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমানতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় রায়ে।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মোট ২০টি অভিযোগে চার্জ গঠন হয়। এর মধ্যে আটটি অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রমানিত আটটি অভিযোগের দুটি হত্যার অভিযোগ। দুটি হত্যার অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির আদেশ দেয়ার কারনে বাকী ছয়টি অভিযোগ প্রমানিত হলেও তাতে কোন শাস্তির কথা উল্লেখ করেননি ট্রাইব্যুনাল। বাকী যে ছয়টি অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ধর্মান্তরকরন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, অপহরন প্রভৃতি।
১২টি অভিযোগ থেকে মাওলানা সাঈদীকে খালাস দেয়া হয় রায়ে। খালাস দেয়া অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের পিতা ফফজুর রহমানসহ পিরোজপুরের তিনজন সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ, ভাগিরথী হত্যা এবং ভানুসাহাকে ধর্ষনের অভিযোগ।
রায় ঘোষনার পরপরই মাওলানা সাঈদী কাঠগড়ায় দাড়িয়ে কিছু বলতে চাইলে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত বিপুল সংখ্যক সরকার পক্ষের, সরকার সমর্থক আইনজীবী এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির লোকজনসহ অন্যান্য লোকজন সমম্বরে তীব্র চিৎকার করে তাকে থামিয়ে দেন। এসময় কেউ কেউ মাওলানা সাঈদীকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি এবং ধমকও দেন। এরপর মাওলানা সাঈদী আর কোন কথা বলেননি। নিরাপত্তা রক্ষীরা তাকে বিচার কক্ষ থেকে বের করে হাজতখানায় নিয়ে যান। হাজতখানায় গিয়ে নামাজে দাড়ান মাওলানা সাঈদী।
আলোচিত এবং ঘটনাবহুল এ মামলার রায় ঘোষনা উপলক্ষে আজ ট্রাইব্যুনালের চর্তুদিকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। রায় ঘোষনার সময় শত শত ভারী অস্ত্রধারী পুলিশ, সোয়াত বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। হরতালের কারনে আজ মাওলানা সাঈদীর রায় ঘোষনার সময় আসামী পক্ষের কোন সিনিয়র আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে হাজির হননি। কয়েকজন জুনিয়র আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। অপর দিকে সরকার পক্ষের আইনজীবীসহ বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সময় সোচ্চার ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতাকর্মীসহ অন্যান্য লোকজন উপস্থিত ছিল ট্রাইব্যুনালে। রায় ঘোষনার পর তারা উল্লাস প্রকাশ করেন।
রায় ঘোষনা উপলক্ষে সকাল থেকে বিপুল সংখ্যাক মিডিয়াকর্মী এবং অন্যান্য লোকজন ভিড় করেন ট্রাইব্যুনালে। ১১টা ১০ মিনিটের সময় মাওলানা সাঈদীকে হাজির করা হয় ট্রাইব্যুনালের বিচার কক্ষে। এর পরই প্রবেশ করেন বিচারকরা। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির বলেন, মোট ১২০ পৃষ্ঠার রায় এটি। তবে পুরো রায় না পড়ে রায়ের সার সংক্ষেপ পড়া হবে বলে জানান তিনি। এরপর তিনি এবং ট্র্ইাবুনালের অপর দুই সদস্য বিাচরপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এবং বিচারপতি আনোয়ারুল হক পালাক্রমে ৫৬ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ভার্সন পড়ে শোনান। ১১টা ২০ মিনিটে রায় পড়া শুরু হয় এবং পৌনে দুইটার সময় রায় পড়া শেষ হয়। ট্রাইব্যুনাল-১ এর প্রথম রায় এটি।
রায় ঘোষনার পর এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি উদাহরন হয়ে থাকবে। অন্যদিকে আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, এ রায়ে আমরা স্তম্ভিত। যে সাক্ষ্যপ্রমাণ দেয়া হয়েছে তাতে মৃত্যুদণ্ড তো দূরে কথা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর এক মিনিটও সাজা হওয়ার সুযোগ নেই।
যে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদন্ড : মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যে ২০টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয় তার মধ্যে আট নং অভিযোগে বলা হয় ১৯৭১ সালের ৮ মে মাওলানা সাঈদীর সাঈদীর নেতৃত্বে পাকিস্তান আর্মি এবং শান্তি কমিটির লোকজন চিথলিয়া গ্রামে যায় এবং মানিক পসারীর বাড়ি লুট করে । এখানে মানিক পসারীর বাড়িসহ ৫টি ঘর তারা কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় লুটপাটের পর। মানিক পসারীর বাড়ি থেকে ইব্রাহীম কৃট্টি এবং মফিজুল নামে দুজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরা দুজন মানিক পসারীর বাড়িতে কাজ করত। মাওলানা সাঈদী এদের দুজনকে ধরে দড়ি দিয়ে বেঁধে পাড়েরহাট বাজারে নিয়ে যান তার সাথে লোকজনের সহায়তায়। এরপর মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে পাকিস্তান আর্মি ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে হত্যা করে। মফিজকে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পর সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের বেশ কয়েকজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। পালিয়ে আসা মফিজও সাক্ষ্য দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছেন মফিজ এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। রায়ে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে উল্লেখ করে মাওলানা সাঈদীকে মুত্যৃ দণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
অপর ১০ নং যে অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে চার্জ ফ্রেমিং অর্ডারে উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৭১ সালের ৬ জুন সকাল ১০টার দিকে উমেদপুর গ্রামে সাঈদীর নেতৃত্বে ২৫টি ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এসময় সাঈদীর নির্দেশে বিশাবালী নামে একজনকে নারকেল গাছের সাথে বেঁধে হত্যা করা হয়।
মুত্যৃদন্ডের অভিযোগ দুটি নিয়ে বিতর্ক : রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ এবং সাক্ষীরা বলেছেন ইব্রাহীম কুট্টিকে ১৯৭১ সালের ৮ মে মানিক পসারীর বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পাড়েরহাট বাজারে মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। অপর দিকে ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম বর্তমাবে জীবিত। তিনি ১৯৭২ সালে তার স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে পিরোজপুরে একটি মামলা করেছিলেন । সে মামলায় তিনি উল্লেখ করেন ১৯৭১ সালে ১ অক্টোবর তার বাবার বাড়িতে থাকা অবস্থায় শান্তি কমিটির লোকজন তার স্বামী ইব্রাহীম কুট্টিকে হত্যা করে। এসময় তার মা সিতারা বেগম এবং ভাই সাহেব আলীকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাকে মাকে ছেড়ে দেয়া হলেও তার ভাই সাহেব আলীকে পিরোজপুরে হত্যা করে পাকিস্তান আর্মি। ইব্রাহীম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম মামলায় ১৩ জনকে আসামী করেন। আসামীর তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। মামলার সেই ডকুমেন্ট আসামী পক্ষ হাজির করেন ট্রাইব্যুনালে। এছাড়া মাওলানা সাঈদীর পক্ষে বেশ কয়েকজন সাক্ষীও সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন ইব্রাহীম কুট্টিকে নলবুনিয়া তার শশুর বাড়িতে থাকা অবস্থায় হত্যা করা হয়। মাওলানা সাঈদী এর সাথে জড়িত ছিলনা।
এছাড়া বিশাবালী হত্যার ঘটনা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালী ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। কিন্তু তিনি মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে গত বছর ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে অপহরনের শিকার হন। আজ পর্যন্ত তার খোঁজ মেলেনি। মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা জানিয়েছেন তিনি ট্রাইব্যুনালে বলতে চেয়েছিলেন তার ভাইকে মাওলানা সাঈদী নয় পাকিস্তান আর্মি গুলি করে মেরেছে।
অপর যে ছয় অভিযোগ প্রমানিত : মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অপর যে ছয়টি অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হল (অভিযোগ নং ৬) পাড়েরহাট বাজারে দোকানপাটে লুটপাটে নেতৃত্ব প্রদান এবং অংশ নেয়া, (৭) শহিদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে আগুন দেয়া, (১১) মাহবুবুল আলম হাওলাদার বাড়িতে লুট এবং তার ভাইকে নির্যাতন (১৪) ১৯৭১ সালে হোগলাবুনিয়া এলাকায় হিন্দু পাড়ায় আক্রমন এবং শেফালী ঘরামী নামে একজন মহিলাকে রাজাকার কর্তৃক ধর্ষনে সহায়তা এবং সেখানে উপস্থিত থাকা (১৬) গৌরাঙ্গ সাহার তিন বোন মহামায়া, আনু এবং কমলা নামে তিন বোনকে অপহরন করে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে তুলে দেয়া এবং (১৯) মুক্তিযুদ্ধ চলাকলে ১০০ থেকে ১৫০ জন হিন্দুকে জোর করে ধর্মান্তরকরন। এসব অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে তবে শাস্তি প্রদান করা হয়নি।
খালাস ১২টি অভিযোগ : যে ১২টি অভিযোগ থেকে মাওলানা সাঈদীকে খালাস দেয়া হয়েছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অভিযোগ হল পিরোজপুরের পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান (হুমায়ূন আহমেদের পিতা), মেজিস্ট্রেট সাইফ মিজানুর রহামান এবং এসডিও আব্দুর রাজ্জাককে হত্যার অভিযোগ। এছাড়া ১৯৭১ সালে পিরোজপুরে নির্মম হত্যার শিকার ভাগিরথীকে হত্যা এবং ভানু সাহাকে ধর্ষনের অভিযোগ থেকেও খালাস দেয়া হয় মাওলানা সাঈদীকে। এছাড়া মাছিমপুর বাস স্ট্যান্ডের পেছনে, মাসিমপুর হিন্দুপাড়া এবং ধোপপাড়া এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যাক হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দেয়া, লুটপাট করা, হিন্দুদের অনেক হিন্দুকে এক দড়িতে বেঁধে হত্যঅ করা, হত্যার উদ্দেশে হিন্দুদের পাকিস্তান বাহিনীর হাতে তুলে দেয়াসহ মোট ১২টি অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ প্রমানিত হয়নি বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরন :
২০১১ সালের ৭ ডিসেম্বর মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এক বছরের মাথায় ২০১২ সালের ৬ ডিসেম্বর মামলার সমস্ত কার্যক্রম শেষে রায়ের তারিখ অপেক্ষমান ঘোষনা করেন ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু স্কাইপ কেলেঙ্কারির জের ধরে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করেন। এরপর মাওলানা সাঈদীসহ অন্যান্য মামলার পুনরায় বিচার দাবি করে দরখাস্ত করা হয় আসামী পক্ষ থেকে। সে আবেদন খারিজ হয়ে যায়। তবে মাওলানা সাঈদীর মামলায় পুনরায় যুক্তি উপস্থাপন শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ১৩ জানুয়ারি পুনরায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয় এবং ২৯ জানুয়ারি উভয় পক্ষের যুক্তি পেশ শেষ হলে সেদিন পুনরায় রায়ের তারিখ অপেক্ষমান ঘোষনা করেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ের তারিখ অপেক্ষমান ঘোষনার এক মাসের মাথায় নির্দিষ্ট করে তারিখ ঘোষনা করলেন ট্রাইব্যুনাল।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলাটিই ছিল প্রথম মামলা। তবে স্কাইপ কেলেঙ্করির কারনে পিছিয়ে যায় এ মামলার রায় ঘোষনার বিষয়টি।
মানিক পসারী নামে এক লোক পিরোজপুরের মেজিস্ট্রেট আদালতে ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ঘটনায় একটি মামলা করেন। এর কয়েক দিন পর ৯ সেপ্টেম্বর মাহবুবুল আলম নামে আরেক ব্যক্তি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের করেন পিরোজপুর মেজিস্ট্রেট আদালতে।
২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুরে মামলার বাদী মাহবুবুল আলম হাওলাদার ২০১০ সালের ২০ জুলাই ঢাকায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে বিচার দাবী করেন। এভাবে মাওলানা সাঈদীর বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের অধীনে আসে এবং বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
তদন্ত সংস্থা ১৪ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় এবং ৩/১০/২০১১ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে আদেশ দেয়া হয় ট্রাইব্যুনাল-১ এ।
এর আগে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া সংক্রান্ত একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয় মাওলানা সাঈদীকে। সেই থেকে তিনি বন্দী রয়েছেন।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২৮ জন সাক্ষী হাজির করে। এর মধ্যে ঘটনার সাক্ষী ছিল ২০ জন (গতকাল আমরা ভুলক্রমে ১৮ জন লিখেছিলাম) । বাকীরা জব্দ তালিকার এবং একজন তদন্ত কর্মকর্তা। রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৬৮ জন ঘটনার সাক্ষীর তালিকা জমা দিয়েছিল ট্রাইব্যুনালে। ৬৮ জনের মধ্য থেকে হাজির করা হয়নি এমন ১৬ জন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
অপরদিকে আসামী পক্ষে মোট ২০ জন সাক্ষীর তালিকা নির্ধারন করে দেন ট্রাইবু্যুনাল এবং তার মধ্য থেকে ১৭ জন সাক্ষী হাজির করে আসামী পক্ষ।
মাওলানা সাঈদীর পক্ষে মামলায় যেসব আইনজীবী অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম, মনজুর আহমেদ আনসারী, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন প্রমুথ।
অন্যদিকে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামালায় রাষ্ট্রপক্ষের নির্ধারিত আইনজীবী ছিলেন সৈয়দ হায়দার আলী।
আলোচিত এবং ঘটনাবহুল একটি মামলা :
১৯৭১ সালে সংঘটিত মাবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ২ এ যে কয়টি মামলা হয়েছে এখন পর্যন্ত তার মধ্যে নানা কারনে সবচেয়ে আলোচিত এবং ঘটনাবহুল মামলা ছিল মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা। মাওলানা সাঈদী একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মোফাসসিরে কোরআন এবং সুললিত কণ্ঠস্বরের অধিকারী হওয়ায় গোটা দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ মামলা।
এই মামলার শুরুতেই প্রশ্ন ওঠে ট্রাইব্যুনালের পদত্যাগী চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নিরপেক্ষতা নিয়ে। এরপর সর্বশেষ স্কাইপ কেলেঙ্কারি এবং ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে মাওলানা সাঈদীর পক্ষের একজন হিন্দু সাক্ষী অপহরনের ঘটনা, রাষ্ট্রপক্ষের হিন্দু সাক্ষী গণেশ চন্দ্র মাওলানা সাঈদীর পক্ষে এসে সাক্ষ্য দেয়ার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। বিদেশী গনমাধ্যমেও স্থান পায় স্কাইপ কেলেঙ্কারি এবং সাক্ষী অপহরনের ঘটনা। স্কাইপ কেলেঙ্কারির কারনে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয় ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুলক হককে। মাওলানা সাঈদীর মামলার বিচারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিচারপতি নিজামুল হক থাকলেও তিনি এ মামলার রায় ঘোষনা করতে পারলেননা। স্কাইপ কেলেঙ্কারির জের ধরে তার পদত্যাগ করতে হয় এবং ট্রাইব্যুনালে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় এটিএম ফজলে কবিরকে। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের কারনে মাওলানা সাঈদীর বিচার কার্যক্রম শেষ হবার পরও আবার নতুন করে শুরু করতে হয় যুক্তি তর্ক উপস্থাপন। এছাড়া বিচার চলাকালে ট্রাইব্যুনালের আরেক সদস্য বিচারক জহির আহমেদ পদতাগ করেন। তাকে সরকারের চাপের কারনে পদত্যাগ করতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিচারক জহির আহমেদ নিয়োগের পর নতুন বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান জাহাঙ্গীর হোসেন । এসব কারনে ট্রাইব্যুনালে প্রথম মামলা হওয়া সত্ত্বেও মাওলানা সাঈদীর মামলার রায় ঘোষনার পূর্বে ট্রাইব্যুনাল-২ এ অন্য দুটি মামলার রায় ঘোষনা করা হয়েছে।
এছাড়া আসামী পক্ষ কর্তৃক সেফ হাউজের ডকুমেন্ট উদ্ধারের ঘটনাও এ মামলার একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল। ১৫ জন সাক্ষীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির না করে তাদের জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করার ঘটনাও বেশ সমালোচনার জন্ম দেয় এ মামলার ক্ষেত্রে।
মাওলানা সাঈদীর মামলায় উভয় পক্ষের হাজির করা সাক্ষীদের জেরা বছরজুড়ে পাঠকের কাছে ছিল আকর্ষনীয় বিষয় । পিরোজপুরের বর্তমান এমপি একেএমএ আউয়াল মাওলানা সাঈদীর বিপক্ষে সাক্ষ্য দেন। মাওলান সাঈদীর পক্ষেও সাক্ষ্য দিয়েছেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা।
ট্রাইব্যুনাল গঠনের শুরুতে আইন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তবে ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে শুরু হওয়া সব বিতর্ক ছাপিয়ে যায় বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপ কেলেঙ্কারির ঘটনা। বিচারের বিভিন্ন বিষয় বেলজিয়াম থেকে লিখে পাঠানোর ঘটনার চিত্র বের হয়ে পড়ে এতে। বিচার কাজে সরকার এবং বাইরের বিভিন্ন ব্যক্তি এবং মহলের যোগসাজস এবং নিয়ন্ত্রনের ঘটনায় দেশ এবং বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিচার বিভাগের ইতিহাসে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা অতীতে আর কখনো ঘটেনি বলে মন্তব্য করেন আইনজ্ঞরা।
এ বিচার চলাকালে এবং বন্দী থাকা অবস্থায় মাওলানা সাঈদী প্রথমে তার মাকে হারান। এরপর গত বছর জুন মাসে বিচার চলাকালে ট্রাইব্যুনালে বসে অসুস্থ হয়ে মুত্যৃর কোলে ঢলে পড়েন তার বড় ছেলে রাফিক বিন সাঈদী। রাফিক বিন সাঈদী মারা যাবার পর মাওলানা সাঈদী কারাবন্দী থাকা অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন তাকে হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। বর্তমানে মাওলানা সাঈদীর বড় ছেলে শামীম সাঈদীও কারাগারে বন্দী রয়েছেন।
মাওলানা সাঈদীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় : মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ১ তারিখ পিরোজপুরের সাঈদখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মওলানা ইউসুফ সাঈদী দেশের দণিাঞ্চলের সুপরিচিত ইসলামী চিন্তাবিদ ও বক্তা ছিলেন।
মাওলানা সাঈদী নিজ পিতার প্রতিষ্ঠিত দ্বীনি শিা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিা লাভ করার পর তিনি ১৯৬২ সালে মাদরাসা শিক্ষা শেষ করে গবেষণা কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
১৯৬৭ থেকে মাওলানা সাঈদী বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এবং বিশ্বের বহু দেশে মহাগ্রন্থ আল কুরআনের তাফসীর করেছেন। তার ওয়াজ শুনে অসংখ্য অনেক হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্মের মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। কোরআন হাদিস এবং ইসলামের ওপর রচনা করেছেন অসংখ্য পুস্তক। পেয়েছেন নানা উপাধি, খ্যাতি ও সম্মান। তার তাফসিরের অডিও ভিডিও পাওয়া যায় দেশে বিদেশে সর্বত্র। দেশে বিদেশে তৈরি হয়েছে তার অগনিত ভক্ত অনুরাগী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ মাওলানা সাঈদীর ওয়াজ মাহফিলে অংশ নিয়েছেন। বিশ্বের বহু দেশ থেকে নামকরা অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রনে তিনি সেসব দেশ সফর করেছেন এবং কোরআনের তাফসির করেছেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন