বুধবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৩

মাওলানা সাঈদীর বিচার// পর্ব3-মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ :

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ :
মেহেদী হাসান
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগে বিচার হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর জেলার পাড়েরহাট বন্দর এলাকায়   রাজাকার ও শান্তি কমিটি গঠনে নেতৃত্ব প্রদান, পাড়েরহাট ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ এবং  মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনেকে হত্যা, নির্যাতনে  নেতৃত্ব প্রদান এবং এসবে অংশগ্রহণ।  পাকিস্তান আর্মি, রাজাকার এবং  শান্তি কমিটির লোকজন নিয়ে পাড়েরহাট বাজারে  হিন্দু  সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ এবং  মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনের  দোকানপাট লুটপাট, বাড়িঘরে  অগ্নিসংযোগ ।  এসব বাড়িঘর  দোকানপাট লুটপাটে নেতৃত্বদান এবং সরাসরি  অংশগ্রহনের অভিযোগ।  ভানুসাহাসহ বিভিন্ন মেয়েদের  ধর্ষন  এবং ধর্ষনের উদ্দেশে গ্রামের  অনেক নারীদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর  ক্যাম্পে  তুলে দেয়ার অভিযোগ।  হত্যা, গণহত্যা,  মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে নিজে জড়িত থাকাসহ এসবে নেতৃত্ব প্রদান, পরিচালনা  এবং পাকিস্তান আর্মিকে এসব অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করার অভিযোগ।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন বা  রাষ্ট্রপক্ষ থেকে দায়ের করা চার্জশিটে ৩২টি অভিযোগ জমা দেয়া হয় ট্রাইব্যুনালে।  এখান থেকে ২০টি অভিযোগ নিয়ে  তার বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এ ২০টি অভিযোগ হল

১.    ১৯৭১ সালের ৪ মে মাওলানা সাঈদীর  নেতৃত্বের লোকজন পাকিস্তানী সেনাদের নিয়ে পিরোজপুর মাছিমপুর বাস স্ট্যান্ডের পেছনে যায়। সেখানে পরিকল্পিতভাবে আগে থেকে লোকজন জড়ো করে ২০ জন নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
২.    একই তারিখে  মাওলানা সাঈদী ও তার দল পাকিস্তানী সেনাদের নিয়ে মাসিমপুর হিন্দুপাড়ায় যায়। সেখানে হিন্দুদের বাড়িঘর লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়।   এসময় পলায়নপর লোকজনের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হলে ১৩ জন মারা যায়।
৩.    একই দিন সাঈদী নিজে মাসিমপুর মনীন্দ্রনাথ ও সুরেশ চন্দ্র মন্ডলের বাড়ি লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় আশপাশের আরো অনেক বাড়িতে আগুন ধরানো হয়।
৪.    একই দিন সাঈদী তার রাজাকার বাহিনী  পাকিস্তানী সেনাদের নিয়ে  ধোপাবাড়ি  সামনে এবং এলজিইডি ভবনের পেছনের হিন্দুপাড়া ঘিরে ফেলে। এসময়  তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হলে দেবেন্দ্রনাথ  মন্ডল, পলিন বিহারী, জগেন্দ্র  মন্ডল, মুকুন্দ বালা মারা যায়।
৫.    পরের দিন  ৫ মে সাঈদী ও তার সহযোগী শান্তি কমিটির মন্নাফ কয়েকজন পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়ে পিরোজপুর হাসপাতালে যায়। সেখান থেকে তারা সাইফ মিজানুর রহমানকে ধরে  বলেশ্বর নদীর তীরে  নিয়ে যায়। সাইফ মিজানুর রহমান ছিলেন  সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতা। একই দিন লেখক হুমায়ুন আহমেদের পিতা পিরোজপুরের সাবডিভিশন পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) ফয়জুর রহমান এবং ভারপ্রাপ্ত এসডিও আব্দুর রাজ্জাককে কর্মস্থল থেকে ধরে নিয়ে বলেশ্বর নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। মাওলানা সাঈদীর উপস্থিতিতে এ তিন সরকারী কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
৬.    দুই দিন পর ৭ মে সাঈদীর নেতৃত্বে শান্তি কমিটির একটি দল পাড়েরহাট বাজারে হিন্দু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের দোকানপাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘরববাড়ি  দেখিয়ে দেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে। এরপর সেসব প্রতিষ্ঠানে নির্বিচানের লুটপাট চালানো হয়। পরে আগুন দেয়া হয়। লুটপাটে  সাঈদী নিজে অংশ নেন। মাখনলাল সাহার দোকান থেকে ২২ সের ¯¦র্ণ লুট করা হয়। মাওলানা সাঈদীর নেতৃত্বে  শান্তি কমিটির লোকজন দোকানপাট লুটে অংশ নেয়।
৭.    পরের দিন ৮ মে  বেলা দেড়টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী নিয়ে বাদুরিয়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে শহিদুল ইসলাম সেলিম খানের বাড়িতে যায়। নুরুল ইসলামকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে এবং পরে তাকে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়। এরপর তাদের বাড়ি আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়।
৮.    একই দিন বেলা  তিনটার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে চিথলিয়া গ্রামে যায় এবং মানিক পশারীর বাড়ি লুট করে । এখানে ৫টি ঘর তারা কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় লুটপাটের পর। মানিক পসারীর বাড়ি থেকে ইব্রাহীম কৃট্টি  এবং মফিজুল নামে দুজনকে  ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সাঈদীর প্ররোচনায় ইব্রাহীমকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং মফিজকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া  হয়।
৯.    ২ জুন সকাল ৯টায়  নলবুনিয়া গ্রামের আব্দুল হালিমের বাড়িতে মূল্যবান জিনিস লুটপাটের পর আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
১০.    একই দিন সকাল ১০টার দিকে উমেদপুর গ্রামে সাঈদীর নেতৃত্বে ২৫টি ঘর আগুন  দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এসময় সাঈদীর নির্দেশে বিশাবালী নামে একজনকে নারকেল গাছের সাথে বেঁধে হত্যা করা হয়।
১১.    একই দিন সাঈদী  পাকিস্তানী সেনাদের নিয়ে টেংরাটিলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে যায় ।   তার বড় ভাই মাহবুবুল আলম হাওলাদারকে নির্যাতন এবং বাড়িতে লুটপাটের পর আগুন ধরিয়ে দেয়া  হয়।
১২.     সাঈদীর নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল পাড়েরহাট বাজারের  ১৪ জন হিন্দুকে  এক দড়িতে বেঁধে গুলি করে হত্যার পর নদীতে ফেলে দেয়া  হয়।
১৩.    যুদ্ধ  শুরুর ২/৩ মাস পর সাঈদীর নেতৃত্বে পাকিস্তানী সেনা দল নলবুনিয়া গ্রামের আজহার আলীর বাড়িতে যায়। আজহার আলীর ছেলে সাহেব আলীকে পিরোজপুর  নিয়ে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
১৪.    মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে ৫০ জনের একটি রাজাকার দল হোগলাবুনিয়া গ্রামের হিন্দুপাড়ায়  যায়। এখানে মহিলাদের ধর্ষণ করা হয় এবং তাদের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়।
১৫.     মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে সাঈদীর নেতত্বে ১৫ /২০ জনের একটি দল হোগলাবুনিয়ার গ্রামের ১০  জন হিন্দুকে  ধরে পাকিস্তান সেনাদের হাতে  তুলে দেয়া হয় এবং তাদের হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়।
১৬.    সাঈদীর নেতৃত্বে পাড়েরহাট বাজারের গৌরাঙ্গ সাহার তিনবোনকে ধরে পাকিস্তানীদের হাতে তুলে দেয়া হয । তিনবোনকে তিন দিন ক্যাম্পে আটকে রেখে ধর্ষনের পর ছেড়ে দেয়া হয়।
১৭.    সাঈদী ও তার নেতৃত্বের রাজাকাররা পাড়েরহাট বাজারের বিপদ  সাহার  মেয়ে ভানুস সাহাকে  তার বাড়িতে আটকে রেখে নিয়মিত ধর্ষণ করত।
১৮.    ভাগীরথী নামে একটি মেয়ে পাকিস্তান সেনা ক্যাম্পে কাজ করত। সাঈদী পাকিস্তানী সেনাদের খবর দেয় যে, ভাগীরথী  মুক্তিযোদ্ধাদের চর হিসেবে পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্পের খবর  মুক্তিযোদ্ধাদের পৌছে দেয়। এরপর পাকিস্তান সেনারা তাকে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
১৯.    সাঈদীর  ১০০ থেকে ১০৫ জন হিন্দুকে জোর করে মুসলমান বানায় এবং তাদের মসজিদে নামাজ পড়তে বাধ্য করে।
২০.     নভেম্বরের শেষের দিকে সাঈদী খবর পান  মানুষজন ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে। তার নেতৃত্বে ১০ /১২ জনের একটি দল ইন্দুরকানী গ্রামে  তালুকদার বাড়িতে আক্রমন চালায়। ৮৫ জনকে আটক করা হয়। ১০/১২ জন বাদ দিয়ে বাকীদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন