ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহারের যে আবেদন জানানো হয়েছে সে বিষয়ে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিচার শুরু করা অনৈতিক, বেআইনী এবং আইন পরিপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আইনজীবীরা। তাদের মতে যিনি বিচার করবেন তার বিরুদ্ধে যেহেতু অনাস্থা এসেছে তাই তার এ বিচার কাজের শুনানীতে অংশ নেয়ার কোন নৈতিক অধিকার নেই ।
যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হককে প্রত্যাহারের আবেদন জানানো হয়েছে মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর পক্ষ থেকে। যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে আটক মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিষ্টার আব্দুর রাজ্জাক ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহারের আবেদন জানান। মাওলানা সাঈদী এতে অভিযোগ করেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি (ঘাদানিক) গঠিত জাতীয় গণতদন্ত কমিশিনের সেক্রেটারিয়েট এর সদস্য ছিলেন।
যে তদন্ত কমিশন বর্তমানে আটক নেতৃবৃন্দকে আগেই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে সেই কমিশনের সাথে সম্পৃক্ত হাইকোর্টের তৎকালীন এ্যাডভোকেট (বর্তমানে বিচারপতি) নিজামুল হককে করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান।
মাওলানা সাঈদী তার আবেদনে বলেন, যেহেতু বিচারপতি নিজামুল হক গণতদন্ত কমিশনের সেক্রেটারিয়েট মেম্বার ছিলেন তাই নিরপেক্ষ বিচারের বিষয়ে মারাত্মক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তার এসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি হিসেবে যেমন তিনি বিশ্বাসযোগ্যতা যোগ্যতা হারিয়েছেন তেমনি ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতা এবং সততা হুমকির মুখে পড়েছে।
মাওলানা সাঈদী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন, চুক্তি, ট্রাইব্যুনাল এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রায়ের উদাহরণ পেশ করে তার আবেদনে বলেন, যিনি আগে থেকেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পক্ষ নিয়ে কাজ করেছেন এবং জড়িত ছিলেন সেই একই ব্যক্তিদের বিচারে তিনি বিচারের আসনে বসতে পারেননা। সেক্ষেত্রে ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা যায়। এটি আন্তর্জাতিক সমস্ত রীতিনীতি, আইন, বাংলাদেশের সংবিধান এবং বিচারপতিদের কোড অব কনডাক্ট এর পরিপন্থী।
বিচারপতিদের কোড অব কনডাক্ট এর ৩(৬) (ক) ধারা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচারপতির নিরপেক্ষতা যদি যৌক্তিকভাবে প্রশ্নপিদ্ধ করা হয় তাহলে ঐ বিচার প্রকৃয়ায় তিনি বিচারপতি হিসেবে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন।
মাওলানা সাঈদীর দায়ের করা ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হককে প্রত্যাহারের আবেদনের শুনানীর দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ১৩ নভেম্বর। অন্যদিকে মাওলানা সাঈদীর বিচারের শুনানী শুরু হতে যাচ্ছে আগামীকাল ৩০ অক্টোবর থেকে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, প্রত্যাহারের আবেদনের নিষ্পত্তি শেষ না করে এ বিচার শুরু করা বেআইনী, আইন পরিপন্থী এবং অনৈতিক। চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সুরাহা না করে বিচার শুরু করলে ধরে নেয়া হবে তারা গায়ের জোরে বিচার করতে চাচ্ছেন। সেটি হবে বিচারের নামে প্রহসন এবং এর কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকবেনা।
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে আবেদন দায়েকরকারী সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিষ্টার রাজ্জাক এ বিষয়ে বলেন, গণতদন্ত কমিশন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছিল সেই প্রতিবেদনই এখন প্রসিকিউশন প্যানেল ট্রাইব্যুনালের কাছে দাখিল করেছে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের অভিযোগের স্বপক্ষে প্রমান হিসেবে। তাই তিনি (চেয়ারম্যান) এই মামলাটির শুনানী করতে পারেন না। তাই আমরা তাকে প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেছি। সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারক হিসাবে নেওয়া তাঁর শপথের লঙ্ঘন। বিচারপতিদের কোড অব কন্ডাক্টের ধারা (কজ) ১,২,৩(৬)(এ), ৩(৬)(ডি)(৪) এর লঙ্ঘন। এছাড়া সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১০ অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন।
আর্জেনটিনার সাবেক প্রেসিডেন্ট পিনোশের বিচার যখন লন্ডনের হাউস অব লর্ডসে ওঠে তখন হাউস অব লডর্সের একজন বিচারপতি লর্ড হসম্যানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। লর্ড হসম্যানের স্ত্রী ছিলেন এ্যমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর বোর্ড অব ডাইরেক্টরের একজন সদস্য। আর পিনোশের বিচারের ক্ষেত্রে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যশনালের সম্পৃক্ততা ছিল। সে কারনে পিনোশের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় লড হসম্যানের নিরপেক্ষতা নিয়ে এবং তাকে সরে দাড়ানোর জন্য বলা হয়। লর্ড হসম্যান সরে দাড়ালেন বিচারকের আসন থেকে।
এই সাইটের যেকোন লেখা, তথ্য উপাত্তা যেকেউ ব্যবহার, পুনমুদ্রন, পুন প্রচার, প্রকাশ করা যাবে; তবে শর্ত হল সূত্র হিসেবে Mehedy Hasan ও https//www.sayedeetrial.blogspot.com
উল্লেখ/লিঙ্ক
করতে হবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন