সোমবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৩

মাওলানা সাঈদীর বিচার// পর্ব8--বিচারপতি নিজামুল হকের সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি তাঁর বিবেকের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে

১৪/১১/২০১১
বিচারপতি নিজামুল হককে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাড়ানোর আবেদনের বিষয়টি তাঁর বিবেকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন আদালত। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই বিচারপতির এব্যাপারে আদেশ দেয়ার আইনগত এখতিয়ার নেই বলে তাঁরা উল্লেখ করেন। তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে অপর দুই বিচারপতি এবিষয়ে মন্তব্য বা আদেশ দিতে পারেন না। তাই বিষয়টি তার (বিচারপতি নিজামুল হক) বিবেকের ওপর নির্ভর করে।
 
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্য বিচারপতি এ. টি.এম ফজলে কবীর ও বিচারপতি এ. কে. এম. জহির আহমেদ আজ  এ আদেশ প্রদান করেন। আদেশে বলা হয়, এর মাধ্যমে বিচারপতি নিজামুল হক-এর প্রত্যাহার সংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তি করা হলো।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হককে প্রত্যাহারের জন্য জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী গত ২৭ অক্টোবর এ আবেদনটি দায়ের করেন। গত রোববার উভয় পক্ষের শুনানী গ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনাল আজ সোমবার আদেশ প্রদানের দিন ধার্য করেন। 

আদেশের পর মাওলনা সাঈদীর পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার  আব্দুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, আদালত আমাদের আবেদন খারিজ করেননি। তারা বিষয়টি বিচারপতি নিজামুল হকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। আমরাও বিষয়টি তার ওপর ছেড়ে দিয়েছি। অন্যান্য আইনজীবীরাও দাবি জানিয়েছেন তার নিজ থেকেই সরে যাওয়া উচিত। গোটা জাতি এখন অপেক্ষা করছে তিনি কি সিদ্ধান্ত নেন তা দেখার জন্য।
তিনি বলেন, তাঁকে সরে দাড়ানের আবেদনের শুনানীতে আমরা যেসব যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছি আদালত আদেশে তা খন্ডন করেননি। তার মানে আমাদের যুক্তি গৃহীত হয়েছে এবং রয়ে গেছে। আইনজীবীরাও বলেছেন, তাঁর নিজ থেকে সরে দাড়ানো উচিত। আমাদের দাবি তিনি অবিলম্বে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। যত দ্রুত তিনি সরে দাঁড়াবেন ততই তা নিজের জন্য এবং ট্রাইব্যুনালের জন্য মঙ্গলজনক। জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষ করছেন তিনি ট্রাইব্যুনাল থেকে কবে চলে যাবেন। বিচারপতি নিজামুল হক যদি পদত্যাগ না করেণ তাহলে কি পদক্ষেপ নেয়া হবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের সামনে এখনো একটি পথ খোলা আছে। আমরা সুপ্রীম জুড়িশিয়াল কাউন্সিলের  কথা চিন্তা করব।

তিনি বলেন, বিচারপতি নিজামুল হক ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য পরিচালনা করলে আমরা ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হবো।  অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, এই আদেশের ফলে ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি হিসাবে নিজামুল হক থাকতে পারবেন। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের অপর দুই বিচারপতি তাঁদের এখতিয়ার নেই উল্লেখ করে সাঈদীর আবেদনটি নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন।


লন্ডনের তিন আইনজীবী আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন- ট্রাইব্যুনাল :
আট নভেম্বর মাওলানা সাঈদী এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নিযুক্ত লন্ডনের তিন আইনজীবী স্টিভেন কে কিউসি, টবি ক্যাডম্যান  এবং জন কামেহ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানকে পদত্যাগের  আহবান জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন। ট্রাইব্যুনাল রেজিস্ট্রার কার্যালয়  ৯  নভেম্বর সে চিঠি গ্রহণ করে। দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় সে চিঠি প্রকাশিতও হয়েছে।

আজ মাওলানা সাঈদীর আবেদন নিস্পত্তির  শুরুতেই রাষ্ট্রপক্ষের  চীফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু লন্ডনের তিন আইনজীবীর চিঠির বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন। এর সাথে সাথেই ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত মাওলানা সাঈদীর কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি কোন বিদেশী আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছেন কিনা। মাওলানা সাঈদী হ্যাঁ সূচক জবাব দেন। এরপর আদালত বলেন, আপনি নিজে সরাসরি  তাদের নিয়োগ দিয়েছেন কিনা। জবাবে মাওলানা সাঈদী বলেন, আমার দেশীয় যেসব আইনজীবী রয়েছেন তাদের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এরপর আদালত তার কাছে জানতে চান, আইনজীবীর চিঠি এবং তারা  যেসব চিঠিপত্র লিখেন এবং বিবৃতি প্রদান করেন সে বিষয়ে আপনার সাথে  কি কোন পরামর্শ করেন ? জবাবে মাওলানা সাঈদী বলেন, সে সুযোগ তো তাদের নেই মাননীয় আদালত। তখন আদালত বলেন, ঠিক আছে। ৯ নভেম্বরে লন্ডনের তিন আইনজীবীর চিঠিসহ তারা বিবৃতি দেন সে বিষয়ে আপনার কোন ধারণা আছে কিনা। মাওলানা সাঈদী বলেন, না। এরপর মাওলানা সাঈদীকে তার আসনে বসতে বলেন।
মাওলানা সাঈদীকে আদালত যখন জেরা করেন তখন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক সেখানে উপস্থিত ছিলেননা। অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। আদালত তার কাছে জানতে চান তিনি  ৯ নভেম্বরের চিঠি বিষয়ে কিছু জানেন কিনা বা এ চিঠি লেখার আগে তার কাছে কোন পরামর্শ করা হয়েছে কিনা। তাজুল ইসলাম এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানান। এরপরই ব্যারিষ্টার রাজ্জাক ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হন।
এবিষয়ে সংক্ষিপ্ত শুনানী শেষে বিচারপতি এ.কে.এম. জহির আহমেদ আদেশ ঘেষানা করেন। আদেশে বলা হয়, লন্ডনের আইনজীবী স্টিভেন কে কিউসি, টবি ক্যাডম্যান  এবং জন কামেহ তারা তাদের নিজ দেশের আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানকে সরে দাঁড়ানোর চিঠির বিষয়ে বিষ্ময় প্রকাশ করে বলেন, তারা কোন্ ক্ষমতা এবং কর্তত্ববলে এধরনের চিঠি লিখেছেন।  এটি একটি স্বাধীন দেশের হাইকোর্টের একজন বিচারপতির প্রতি অবমাননার শামিল। আদেশে ট্রাইব্যুনাল বলেন, তারা বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন মাওলানা সাঈদী তাদের মক্কেল। কিন্তু তারা বাংলাদেশের নাগরিকও নন এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্যও নন। তারা বিদেশী নাগরিক। আদালত বলেন, আমরা বুঝতে অক্ষম যে একটি বিচারাধীন বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানকে সরে দাঁড়ানোর আবেদন জানিয়ে ইমেইল বার্তা পাঠাতে পারেন। দাবী অনুযায়ী একজন আইনজীবী যদি মক্কেল কর্তৃক নিযুক্ত হয়েও থাকেন তবুও তাকে তার নিজ দেশের এবং অভিযুক্ত যে দেশে অবস্থান করেন সেদেশের আচরণবিধি মানতে বাধ্য থাকবেন। আদালত আদেশে উল্লেখ করেন, উক্ত তিন আইনজীবী আলজাজিরা টেলিভিশনসহ নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিষয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন। গত ৯ নভেম্বর তাদের  প্রেরিত চিঠির ফুটনোটে উল্লেখ করেছেন চিঠিটি গোপনীয়। কিন্তু  একই চিঠিটি দৈনিক সংগ্রামসহ অন্যান্য জাতীয় দৈনিকে পাঠানো হয়েছে।  আদালত এ আদেশে প্রশ্ন রেখে বলেন, তাহলে বিষয়টি গোপনীয় হয় কিভাবে। এতে পরিস্কার যে একটি স্বাধীন দেশের সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিকে অবমাননার জন্য এ চিঠি লিখা হয়েছে। এ ট্রাইব্যুনালের আদেশটি লন্ডনের বার স্ট্যন্ডার্ডস বোর্ড এবং বাংলাদেশের আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ব্যারিষ্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তারা আইনজীবী হিসেবে মতামত দিতে পারেন।  তারা সাঈদী নিযুক্ত  আইনজীবী কিনা সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই তারা সাঈদী  এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধরী নিযুক্ত আইনজীবী। আমরা তাদের বিষয়ে অনেক আগেই বলেছি। বার কাউন্সিলের কাছে আবেদনও জানিয়েছে। কিন্তু আমাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আমরা আবারো আবেদন করব।



এই সাইটের যেকোন লেখা, তথ্য উপাত্তা যেকেউ ব্যবহার, পুনমুদ্রন, পুন প্রচার, প্রকাশ করা যাবে; তবে শর্ত হল সূত্র হিসেবে Mehedy Hasan https//www.sayedeetrial.blogspot.com  উল্লেখ/লিঙ্ক  করতে হবে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন